
রাত ২টা !
পূর্ণিমার চাঁদ আঁকাশে জ্বলমল করছে। আমি কোনো একটা জঙ্গলের পাশ দিয়ে হাটতেছি। চারদিকে ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন। কিন্তু কোথায় যাচ্ছি তা বুঝতে পারতেছিনা। হঠাৎ জঙ্গলের ভিতরে কিছু এ্কটা নড়ে উঠলো। জঙ্গলটা আমার বামদিকে আমি তাকালাম কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না। তারপর আবার হাটতে থাকলাম। একটু পর একজন বৃদ্ধ লোকের সাথে দেখা উনি আমাকে কিছু একটা বলছে কিন্তু আমি কিছু বুঝতেছিনা ! মনে হচ্ছে উনি কোনো বিদেশী ভাষায় কথা বলছে। আমি আবার হাটতে শুরু করলাম।
একটু দূরে একটা মেয়েকে দেখতে পাচ্ছি। দূর থকে দেখে মনে হচ্ছে সাদা একটা একটা উড়না পেছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়স বাইশ-তেইশ হবে। দেখতে অনেকটা সরু সুপারি গাছের মত চিকন। আমাকে হাতের ইশারায় ডাকছে। তারপর ওর পিছনে থাকা একটা ভাঙ্গা কুঠুরিতে ঢুকলো। দেখে মনে হচ্ছে দুশো বছরের পুরোনো। আমিও ধীরে ধীরে কুঠুরিতে ডুকলাম। কিন্তু কেউ তো নেই এখানে ! চারদিকে শুধু মাকড়সার বাসা। হঠাৎ মনে হলো উপর থেকে মাথার উপর টপ টপ করে কিছু পরতেছে। হাত দিয়ে দেখি রক্ত! তারপর উপরে তাকিয়ে দেখলাম একটা কাটা মাথা ঝুলছে!
বিকট একটা শব্দ হলো। ঠিক তখনই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তারপর বোঝা গেল টপ টপ করে যে রক্ত পড়ছিল তা আসলে বৃষ্টির ফোটা। বাইরে বজ্র বৃষ্টি হচ্ছে। রাতে জানালা খোলা ছিল। আমি সাধারণত রাতে জানালা আটকায় না। আমার দমবন্দ লাগে।
এখন আপনারা আমার পরিচয় জানতে চাইতে পারেন।
আমি কে?
যদিও এই প্রশ্ন আমি নিজেকে নিজেই করি কিন্ত কখনো উত্তর পায় না।
আমার নাম মেঘালয়। সবাই মেঘ বলে ঢাকে। আমার সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে আমাকে অনেকক্ষণ ভাবতে হয়, কি বলবো? কারণ আমার সম্পর্কে আমার নিজের ধারণাই সল্প। আমি এক ভিন্ন জগতের ভিন্ন প্রজাতি! পুরোপুরি মানুষ হয় নাই এখনো। কিন্তু চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সকাল ৯টা
প্রতিদিন অ্যালার্ম দিয়েও ছয়টায় ঘুম থেকে উঠতে পারি না। একটা বইতে পড়লাম একজন মানুষ যদি দেরিতে ঘুমায় ও দেরিতে উঠে। তাহলে তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। আমি এমনিতেই অর্ধ-ভারসাম্যহীন। তাই বেশ কিছুদিন ধরে স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন হচ্ছি।
আজ রূপসীর জন্মদিন। বাবার একমাত্র মেয়ে। অক্সফোর্ড থেকে ইংলিশে মাস্টার্স কমপ্লিট করে এখন একটা কিন্ডার গার্ডেনের ইংরেজি শিক্ষক হিসাবে এখানে নিজের বাকি জীবন অনেক সুখে কাটাচ্ছে। তার মতে জীবন হচ্ছে সরলরেখার মত সোজা, নদীর স্রোতের মত সহজ এবং ফুলের মত সুন্দর।
তার জন্মদিন একটু বিশেষভাবে পালন করা হয়। তার বাবা জনাব রফিকুজ্জামান সংস্কৃতি মন্ত্রী। তাই বিশাল আয়োজনের কমতি থাকে না।
দেশের বড় বড় গায়ক, নৃত্যশিল্পী, অভিনেতা, কবি, সাহিত্যিক সবাই আসেন। সন্ধ্যার পর বাড়ির বাগানে আলো জ্বলে ওঠে। বড় একটা মঞ্চ বানানো হয়। নেদারল্যান্ডস থেকে আনা বিভিন্ন রকম ফুল দিয়ে সাজানো হয় সেই মঞ্চ। মঞ্চের সামনে দামি চেয়ার। সব কিছু অনেকটা রাজকীয় স্টাইলে সাজানো হয়। বামপাশে একটা ফটোশুট করার জায়গা থাকে। ওইখানে রূপসী সেজে বসে থাকে সবাই গিয়ে ছবি তুলে। রূপসীর প্রিয় রং সাদা। তাই জন্মদিনে রূপসী সবসময় একটা সাদা রঙের ড্রেস পরে থাকে। ওইসময় রূপসীকে দেখতে অনেকটা সাদা পরীর মত লাগে।
গত বছর যখন আমি প্রথম ওর জন্মদিনে যাই। গেইটে ডুকতে গিয়ে দেখি দুইজন বিশাল দেহের পুলিশ অফিসার দাড়িয়ে। আমি যখন গেইটের কাছাকাছি যাই। ওরা আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে ছিলো মনে হচ্ছিলো আমাকে দেখে ওদের খুব একটা পছন্দ হয় নাই। তাদের মুখ এমন গম্ভীর ছিলো যে আমি পা বাড়াতে ভয় হচ্ছিলো যদি না গ্রেফতার করা ফেলে! কিন্তু ওই অবস্থায় তো আবার পিছনে ফিরে দৌড় দেওয়ার ও সুযোগ নেই তাহলে আরো সন্দেহ করবে। তাই কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে যখন ঢুকতে চেষ্টা করি তাদের একজন জিজ্ঞাসা করে উঠলো,
_আপনার নাম জানতে পারি?
আমি বললাম মেঘালয়।
তারপর উনি হাতে থাকা লিষ্ট দেখে। কিন্তু অনেক খুঁজেও যখন মনে হচ্ছে নাম খুঁজে পাচ্ছে না। আমি মোটামুটি ভয়ে ঘামতে শুরু করি। আর ঠিক করি আজকে এই অবস্থা থেকে বাঁচলে আর কখনো আসবো না। অনেক খোঁজার পর খুব শেষের দিকে উনি খুঁজে পেয়েছে। তারপর হাসি মুখে বলবো।
_জ্বি ধন্যবাদ আপনি যেতে পারেন।
আমি কোনো রকমে ভিতরে ডুকি। কিন্তু পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়া শুরু হলো যখন আমি যখন ভিতরে ঢুকি। মনে হচ্ছিলো কোনো এক রাজপ্রাসাদে ডুকে গেছি। চারদিকে বিশাল সব আয়োজন দেখে আমি এক পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কোনো রকম নিজেকে সবার থেকে আড়াল করার চেষ্টা করতেছিলাম। একটু দূরে দেখলাম রূপসীকে কিন্তু কাছে আর যায় নাই। একটু পর হঠাৎ একজন লোক এসে বললো
_তুমি! তোমাকে তো চিনলাম না!
আমি বললাম ডেকোরেশনের লোক। তারপর কোনো রকমে বের হয়ে আসি। আসলে আমাকে ইনভাইট করেছিলো রূপসী ওর বাবা মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে বলে। কিন্তু যা পরিস্থিতি মনে হচ্ছে না আমি আর কখনো যাবো।
রূপসীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় আরো ২ বছর আগে। ওদের বাড়ির পাশের পার্কে। আমি একদিন দুপুরবেলা পার্কের শেষ দিকের একটা বেঞ্চে বসে ছিলাম। রূপসীও আসে ঠিক আমার সামনের বেঞ্চে বসে। তারপর আমার দিকে কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে তাকিয়ে থাকে। আমি জিজ্ঞাসা করি আপনি কি আমাকে দেখছেন?
_না, আপনাকে দেখার কি আছে!
আপনি যেভাবে তাকিয়ে আছেন মনে হচ্ছে তো আমাকেই দেখছেন।
_তো আপনি কি ভাবতেছেন আমি আপনার প্রেমে পরে গেছি যে আর চোখ পেরাতে পারছি না।
আমি কি বলবো আর বুঝতে পারি নাই আর কিছু বলি না। আমার চুপ হয়ে যাওয়া দেখে রূপসী হেসে ফেললো। তারপর বললো
_আপনি কি ভয় পেয়েছেন ? আমি আসলে প্রতিদিন ক্লাস শেষ করে এখানে এসে বিশ্রাম নেই। আপনি যেই বেঞ্চে বসে আছেন ওইটাতে কিন্তু আজকে আপনি এসে এখানে বসে আছেন। তাই কিছুটা হতাশ।
আমি আসলেই দুঃখিত। আমি জানতাম না যে এইটায় আপনি প্রতিদিন এখানে এসে বসেন। তারপর বেঞ্চ থেকে উঠে যায়। পাশের আরেকটা বেঞ্চে গিয়ে বসি।
রূপসী আবার হেসে দিলো।
_না না সমস্যা নেই আপনি বসুন। আমি তো আজকে এখানে বসছি।
আমি বললাম সমস্যা নাই আপনি আজকেও বসতে পারেন। আপনার একটা প্রতিদিনের রুটিনে আমি সমস্যা করতে চাই না। আসলে আমিও এখানে মাঝে মাঝে আসি এই বেঞ্চেই বসি কিন্তু সন্ধ্যায়। তাই হয়তো আপনার সাথে কখনো দেখা হয় নাই।
আমার কথা শুনে রূপসী একটু অবাক হয়।
_আপনিও প্রতিদিন আসেন এখানে?
প্রতিদিন না মাঝে মাঝে যখন অনেক বেশি ঝামেলাই থাকি।
_আচ্ছা, আজকে কি ঝামেলাই পরে এসেছেন?
আমি আমার বিষয়ে কারো সাথে কথা বলি না।
_আপনি কিছুটা অদ্ভুত মনে হচ্ছে। আপনার নাম জানতে পারি?
আমি কিছুটা না অনেকটাই অদ্ভুত। নাম মেঘালয় সবাই সংক্ষেপে মেঘ বলে ডাকে।
_আচ্ছা আচ্ছা, আমি রূপসী। আপনার সাথে পরিচয় হয়ে ভালো লাগলো।
তারপর সে চলে যায়। ওইদিনের পরে মাঝে মাঝেই ওইখানে গিয়ে রূপসীর সাথে দেখা হতো, কথা হতো।